মানুষ কি সত্যিই শুধু নিজের লাভের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়? — Amartya Sen-এর “Rational Fools” (1977)

অর্থনীতির বই খুললে আমরা খুব পরিচিত একটি ধারণা পাই— homo economicus। এই ধারণা অনুযায়ী মানুষ পুরোপুরি rational এবং সে সব সময় এমন সিদ্ধান্ত নেয় যা তার নিজের self-interest বা ব্যক্তিগত লাভকে সর্বাধিক করে। সহজ করে বললে, মানুষ যেন এক ধরনের হিসাবি সত্তা—যে প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে মনে মনে লাভ-ক্ষতির হিসাব করে এবং শেষে এমনটিই বেছে নেয় যা তার utility বা সন্তুষ্টি বাড়ায়।

কিন্তু বাস্তব জীবন কি সত্যিই এত সরল?

এই প্রশ্নটাই তুলেছিলেন Amartya Sen তার ১৯৭৭ সালের বিখ্যাত পেপার “Rational Fools: A Critique of the Behavioral Foundations of Economic Theory”-এ। অনেক গবেষক মনে করেন, এই লেখাটি পরবর্তীতে জনপ্রিয় হওয়া behavioral economics-এর অনেক ধারণার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

Sen মূলত দেখাতে চেয়েছেন, মানুষের আচরণকে শুধু self-interest দিয়ে ব্যাখ্যা করা খুব সীমিত একটি দৃষ্টিভঙ্গি। যদি আমরা ধরে নিই যে মানুষ কেবল নিজের লাভের কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেই মানুষটি বাস্তব সমাজের মানুষের মতো আর থাকে না। Sen মজা করে বলেন, এমন একজন মানুষ প্রায় একটি “social moron” হয়ে যায়—অর্থাৎ এমন এক ব্যক্তি যার মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা বা অন্যদের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা নেই।

Traditional economics-এ আরেকটি ধারণা আছে—revealed preference theory। এখানে বলা হয়, মানুষ যে সিদ্ধান্ত নেয় সেটিই তার preference এবং সেই সিদ্ধান্ত তার utility বাড়ায়। কিন্তু এই যুক্তি ব্যবহার করলে এক ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। কারণ এক্ষেত্রে আমরা প্রায় সব আচরণই একইভাবে ব্যাখ্যা করছি। যেমন- কেউ দান করলে বলা যায় তার utility বাড়ছে, কেউ ভোট দিলে বলা যায় তার utility বাড়ছে, কেউ অন্যকে সাহায্য করলে সেটাও utility বাড়াচ্ছে। তখন তত্ত্বটি সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু আসলে কোন আচরণের পেছনে প্রকৃত কারণ কী—সেটি আর স্পষ্ট থাকে না।

এই জায়গায় Sen মানুষের আচরণের দুটি আলাদা মোটিভেশন নিয়ে কথা বলেন—Sympathy এবং Commitment।

Sympathy হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে অন্যের ভালো-মন্দ আমাদের নিজের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো আত্মীয় বা বন্ধুর ভালো খবর শুনে আমরা খুশি হই। এখানে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো সরাসরি লাভ নেই, তবুও অন্যের সুখ আমাদের নিজের সুখ বাড়ায়। অর্থাৎ অন্যের welfare আমাদের utility-কে প্রভাবিত করছে।

 অন্যদিকে Commitment হলো এমন একটি সিদ্ধান্ত যেখানে মানুষ নিজের লাভের কথা না ভেবেও নৈতিক বা সামাজিক কারণে কোনো কাজ করে। ধরি, একটি নিরিবিলি রাস্তায় টাকা ভর্তি একটি মানিব্যাগ পেলাম, আশেপাশে কেউ নেই, কেউ দেখছে না। তবুও আমি সেটা মালিককে খুঁজে ফিরিয়ে দিলাম। Traditional economics অনুযায়ী এটি আমার ব্যক্তিগত লাভ বাড়াচ্ছে না। কিন্তু তবুও আমি এটি করছি সততা, দায়িত্ববোধ বা ব্যক্তিগত মূল্যবোধের কারণে।

এই ধারণা দিয়ে Sen বোঝাতে চান যে মানুষের আচরণ কেবল self-interest দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বাস্তবে মানুষ অনেক সময় নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব, সহমর্মিতা কিংবা ন্যায়বোধ থেকেও সিদ্ধান্ত নেয়। যেমন-মানুষ ভোট দেয়, কর দেয়, কিংবা অনেক কর্মী শুধু অর্থের জন্য নয় বরং দায়িত্ববোধ থেকেও কাজ করে।

সবশেষে Sen-এর মূল বক্তব্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মানুষকে irrational বলতে চান না। বরং তিনি সমালোচনা করেন অর্থনীতিতে rationality-র যে সংকীর্ণ সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়, সেটিকে। Traditional অর্থনীতিতে rationality প্রায়ই self-interest এর সাথে যুক্ত করে দেখা হয়, যেন rational হওয়া মানেই নিজের লাভ সর্বাধিক করা। Sen বলেন, এই সংজ্ঞাটি খুব সীমিত। মানুষের rationality আসলে অনেক বেশি complex এবং enriched, যেখানে নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ, পরিচয় এবং অন্যদের প্রতি সহমর্মিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ Sen-এর যুক্তি হলো, মানুষকে irrational বলা নয়; বরং rationality-র ধারণাটিকেই আরও বিস্তৃতভাবে বোঝা দরকার। Self-interest অবশ্যই মানুষের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে, কিন্তু সেটিই সব নয়। মানুষের সিদ্ধান্তের পেছনে আরও অনেক সামাজিক ও নৈতিক উপাদান কাজ করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই পরবর্তীতে Behavioral Economics-এ মানুষের আচরণকে আরও বাস্তবভাবে বোঝার পথ খুলে দেয়। কারণ এতে স্বীকার করা হয় যে মানুষ কেবল হিসাবি অর্থনৈতিক সত্তা নয়; সে একই সাথে সামাজিক, নৈতিক এবং মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত একটি জটিল মানবসত্তা।


#rationalfools #homoeconomicus #behavioraleconomics #rationality #amrtyasen 

Post a Comment

0 Comments